 |
| নাইন-ইলেভেন পরবর্তী দুই দশক: ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ নাকি ৯.৪ লাখ মানুষের মৃত্যুযজ্ঞ? |
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলার পর বিশ্বজুড়ে শুরু হওয়া ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ বা ‘War on Terror’ আজ দুই দশক পেরিয়ে এক ভয়াবহ ও বিতর্কিত অধ্যায়ে দাঁড়িয়েছে। আমেরিকার নেতৃত্বাধীন এই যুদ্ধে গত ২০ বছরে বিশ্বের অন্তত ১০টি দেশে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৯ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্টস অফ ওয়ার’ (Costs of War) প্রকল্পের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
[ad1]
গণমৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞের আন্তর্জাতিক খতিয়ান
প্রতিবেদনে দেখা যায়, নাইন-ইলেভেনের প্রতিশোধ নিতে আমেরিকা আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া এবং সোমালিয়াসহ বিভিন্ন দেশে সরাসরি সামরিক অভিযান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। প্রত্যক্ষ সহিংসতায় নিহত ৫ লক্ষাধিক মানুষের বাইরেও যুদ্ধজনিত রোগ, অপুষ্টি এবং বিশুদ্ধ পানির অভাবে আরও কয়েক লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত এসব দেশ থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৃহত্তম শরণার্থী সংকট তৈরি করেছে।
[ad2]
‘সন্ত্রাসবাদ’ বনাম ‘রাষ্ট্রীয় আগ্রাসন’: সংজ্ঞার লড়াই
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটি বর্তমানে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর আধিপত্য বিস্তারের একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। যখন একটি রাষ্ট্র অন্য সার্বভৌম দেশে হামলা চালিয়ে লক্ষ লক্ষ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে, তখন তাকে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোতে ‘সামরিক ব্যর্থতা’ বা ‘নিরাপত্তা অভিযান’ বলা হয়। কিন্তু কোনো স্থানীয় গোষ্ঠী তাদের ভূখণ্ড রক্ষা বা বিদেশি শক্তির বসানো ‘পুতুল সরকারের’ বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরলে তা দ্রুত ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যা পায়।
[ad3]
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা থেকে শুরু করে ফিলিস্তিনি মুক্তি আন্দোলনের অনেক সংগঠনকে এক সময় পশ্চিমা বিশ্ব ‘সন্ত্রাসী’ তালিকায় রেখেছিল। অথচ সময়ের ব্যবধানে তারা বিশ্বজুড়ে মুক্তিকামী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই দ্বিমুখী নীতি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা।
স্থানীয় পর্যায়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর গ্রহণযোগ্যতা ও শরিয়াহ শাসন
ইয়েমেনের আনসারুশ শারিয়া, সোমালিয়ার আল-শাবাব কিংবা আফগানিস্তানের তালেবানের মতো গোষ্ঠীগুলো আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ হলেও স্থানীয় পর্যায়ে তাদের বিশাল জনসমর্থন রয়েছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে:
১. দুর্নীতিমুক্ত দ্রুত বিচার: পশ্চিমা সমর্থিত দুর্নীতিগ্রস্ত আদালতের বদলে এসব গোষ্ঠী দ্রুত ও স্বল্প খরচে শরিয়াহ ভিত্তিক বিচার নিশ্চিত করে, যা সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছে।
২. পুতুল সরকারের ব্যর্থতা: বিদেশি মদদপুষ্ট সরকারগুলোর সীমাহীন দুর্নীতি ও সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্নতা এই গোষ্ঠীগুলোকে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
৩. আগ্রাসনের প্রতিবাদ: যখন কোনো অঞ্চলে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিরপরাধ মানুষ মারা যায়, তখন স্থানীয়রা দখলদারদের তাড়াতে এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর দিকেই ঝুঁকে পড়ে।
উপসংহার: ইতিহাসের শিক্ষা
আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনাদের বিদায় এবং তালেবানের ক্ষমতা দখল প্রমাণ করেছে যে, কেবল সামরিক শক্তি বা ‘সন্ত্রাসী’ তকমা দিয়ে কোনো আদর্শ বা জনসমর্থনপুষ্ট আন্দোলনকে দমন করা সম্ভব নয়। ৯ লক্ষাধিক মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই বিশ্বব্যবস্থা এখন এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি। বিশ্বশান্তি তখনই সম্ভব যখন নিরপরাধ মানুষ হত্যার দায় শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোকেও নিতে হবে এবং ‘সন্ত্রাসবাদ’-এর সংজ্ঞাটি রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বজনীন মানবিক মানদণ্ডে বিচার করা হবে।
তথ্যসূত্র: কস্টস অফ ওয়ার প্রজেক্ট (ব্রাউন ইউনিভার্সিটি), অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (UNHCR)