>
আপনার ব্র্যান্ডের প্রচার করুন আমাদের সাথে।
![]() |
| শাপলা ম্যাসাকার নিয়ে গবেষণা |
রাজনীতি নিয়ে আলাপ করেন বা সচেতন থাকেন, কিন্তু ২০১৩ সালের শাপলা ট্রাজেডি সম্পর্কে জানেন না, এমন মানুষ পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। রাষ্ট্রীয় বাহিনী দ্বারা একটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সমাবেশকে সহিংসভাবে ছত্রভঙ্গ করা হয়েছিল, যার ফলে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে, নিহত হয় অনেক আলেম-ছাত্র ও সাধারণ নাগরিকেরা। কিন্তু এই ম্যাসাকার নিয়ে খুব একটা ডকুমেন্টেশন হয়নি।
[ad1]
সম্প্রতি মোহাম্মাদ সরোয়ার হোসেন, মুনাইম খান, সাদীদ হোসেন এবং এস এম ইয়াসির আরাফাত একটি গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন যে সেদিন কী কী হয়েছিল। তাদের মতে, বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের পরিচালিত এই গবেষণাটি কয়েকটি মাধ্যমিক উৎসের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছিল, যার মধ্যে ‘অধিকার’ এবং ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য-অনুসন্ধান প্রতিবেদন, সরকারি তথ্য ও মিডিয়া আর্কাইভ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গবেষকেরা বলছেন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে, শাপলা চত্বরের দমন-পীড়ন নীরবতার আড়ালে ছিল। তাদের মতে, যদি কোনো গবেষক, সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মী সরকার বিষয়ক সংবেদনশীল বিষয় বা রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের প্রতিবেদন তৈরির সাথে জড়িত থাকতো, তবে তাকে কারাদণ্ড অথবা গুমের শিকার হতে হতো।
![]() |
| শাপলা গণহত্যার পর দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভি বন্ধ করে দেওয়া হয় |
[Labelbox label="গণহত্যা" limit="3" type="list"]
২০১৩ সালে ‘অধিকার’ তাদের প্রতিবেদন প্রকাশের পর রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার হয়; তাদের কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয় এবং শীর্ষ দুই কর্মকর্তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে ৫ই আগষ্টে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পরে শাপলা ম্যাসাকারের কথা নতুন করে আলাপে আসতে শুরু করে। তখন ‘অধিকার’ নিহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করে।
২০১৩ সালে রাসুল (স) এর অবমাননাকারীরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এছাড়াও আরও কিছু জাতীয় ইস্যু তৈরি হয়। সকলা ইসলামবিরোধী শক্তি-ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলাম ঢাকার শাপলা চত্বরে একটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয় এবং নিজেদের দাবি তুলে ধরে। গবেষণাপত্রটিতে ‘অধিকার ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্ট’ এর বরাতে বলা হয়েছে যে এই সমাবেশে নেতৃত্বে ছিল বিভিন্ন মাদ্রাসা শিক্ষকেরা এবং উপস্থিত জনতার অনেকেই ছিলেন কওমি ঘরানার ছাত্র।
গবেষণাপত্রটিতে বলা হয়, ৫-৬ মে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর অভিযানে আনুমানিক ৯৩ থেকে ৩০০ জনেরও বেশি ব্যক্তি নিহত হন। ৬১টি নিশ্চিত মৃত্যুর ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে ৮০% ব্যক্তিই মাদ্রাসা-বহির্ভূত ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রায় ৭,৫০০ ব্যক্তিকে মোতায়েন করা হয়েছিল এবং ১,৫০,০০০ রাউন্ডেরও বেশি গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছিল।
সরকারের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, গণমাধ্যমের উপর ব্ল্যাকআউট এবং নাগরিক সমাজের উপর দমন-পীড়ন চালানো-এগুলো মূলত রাষ্ট্রের চূড়ান্ত সহিংসতার উদাহরণ ছিল।
[ad2]
২০০৯ সালে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের বিচারের উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) গঠিত হয়। তবে এই ট্রাইবুনালের স্বচ্ছতা নিয়ে অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। হাসিনা সরকারের পতনের পর এই উদ্বেগ সত্যও প্রমাণিত হয়েছে।
২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আইসিটি জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলে অস্থিরতা শুরু হয়।এরপর শাহবাগ আন্দোলন গড়ে ওঠে, গঠিত হয় গণজাগরণ মঞ্চ এবং বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী তার ফাঁসির দাবি তোলে। তবে ১৭ ফেব্রুয়ারি দৃশ্যপটে পরিবর্তন আসে। ইসলাম, নবি(স) এবং উম্মাহাতুল মুমিনীন সম্পর্কে গণজাগরণ মঞ্চের কিছু প্রতিনিধি, যারা নিজেদেরকে ব্লগার পরিচয় দিতো, তাদের অত্যন্ত অবমাননাকর মন্তব্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
এমনি একজন কুখ্যাত ব্লগার ছিলেন রাজিব হায়দার। ১৫ ফেব্রুয়ারি তাকে হত্যা করা হলে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা তাকে ‘দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ’ হিসেবে অভিহিত করেন। এভাবে একজন ইসলামবিদ্বেষীকে মর্যাদা দিয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করায় ইসলামিক মহলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
শাহবাগ আন্দোলনে ইসলামবিদ্বেষ ছড়ানো এবং সরকার প্রধানের বাজে মন্তব্যের প্রতিবাদে ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে হেফাজতে ইসলাম কর্মসূচি শুরু করে। সংগঠনটির উদ্যোগে ৬ এপ্রিল লং মার্চের ডাক দেওয়া হয়, যেখানে লাখ লাখ মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হয়। তাদের ১৩ দফা দাবি পূরণ না হওয়ায় ৫ মে ২০১৩-এ তারা পুনরায় বিশাল সমাবেশের ডাক দেয়।
[Labelbox label="শাপলা" limit="3" type="grid"]
৪ মে রাত থেকে মাদ্রাসা ছাত্র, আলেম এবং সাধারণ নাগরিকসহ লাখ লাখ সমর্থক রাজধানীতে প্রবেশ করতে শুরু করে। ৫ মে ভোরের মধ্যে তারা রাজধানীর প্রধান ছয়টি প্রবেশপথে সমবেত হয় এবং কার্যকরভাবে শহরটি অবরোধ করে। হেফাজত নেতারা শাপলা চত্বরে অহিংস সভা ও দোয়ার অনুমতির জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সঙ্গে আলোচনা করেন। পুলিশ অনিচ্ছাসত্ত্বেও সমাপনী মোনাজাতসহ সন্ধ্যা পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়।
দিন বাড়ার সাথে সাথে বিশাল মিছিল ব্যারিকেড ভেঙে শাপলা চত্বরের দিকে এগিয়ে যায়। পথে হেফাজত কর্মীরা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের—যাদের কেউ কেউ সশস্ত্র ছিল—পরিকল্পিত হামলার শিকার হয়। পুলিশকে সহিংসতা থামানোর পরিবর্তে হামলাকারীদের সহায়তা করতে দেখা গেছে। সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে, টিয়ার গ্যাস ও গুলি চালানো হয় এবং অন্তত তিনজন নিহত ও অনেকে আহত হন। হেফাজত সমর্থকরা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে নিজেদের রক্ষার চেষ্টা করে।
বিকেল নাগাদ হেফাজত নেতারা শাপলা চত্বরে পৌঁছান এবং এলাকাটি হাজার হাজার সমর্থকে পূর্ণ হয়ে যায়। নেতারা ঘোষণা করেন যে তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা স্থান ত্যাগ করবেন না। রাত ৮টার দিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রকাশ্যে সমর্থন প্রকাশ করেন এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের হেফাজতকে সহায়তার আহ্বান জানান।
এর জবাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কঠোর অবস্থান নেয়। দলের সাধারণ সম্পাদক বিকেল ৪টার মধ্যে এলাকা ত্যাগ করার আল্টিমেটাম দেন এবং গুরুতর পরিণতির সতর্কবার্তা দেন। এদিকে, হেফাজত আমীর আল্লামা আহমদ শফী লালবাগ মাদ্রাসায় অবস্থান করছিলেন। পুলিশ মাদ্রাসা ঘেরাও করলে তিনি বিক্ষোভ কর্মসূচি স্থগিত করতে বাধ্য হন।
রাতের শেষ দিকে পরিস্থিতি শান্ত মনে হচ্ছিল। প্রতিবাদকারীরা রাস্তায় রাত কাটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অনেকে ফুটপাতে শুয়ে পড়েন, কেউ কেউ তসবিহ পাঠ বা জিকিরে মগ্ন ছিলেন। ৬ মে রাত ১২:৩০টার দিকে মতিঝিল এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ ইচ্ছাকৃতভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়। বিক্ষোভকারীদের সাউন্ড সিস্টেমের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে যে রাত ২:১৫টার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৭,৫০০ সদস্য ঘুমন্ত জনতার ওপর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এক্ষেত্রে টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, ফুটন্ত পানি এবং তাজা গুলি ব্যবহার করা হয়েছিল। হাজার হাজার নিরস্ত্র জনতাকে (হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে অন্তত ৫০,০০০ জন) ছত্রভঙ্গ ও হত্যা করার পুরো অপারেশনটি ছিল মাত্র ২০ মিনিটের।
[ad3]
পূর্বে উল্লিখিত চারজনের গবেষণাপত্রটিতে বেশ কিছু উপাত্ত সংকলিত হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, শাপলা চত্বর অভিযানে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর প্রায় ৭,৫০০ সদস্য অংশগ্রহণ করেছিলেন। আর বিভিন্ন বাহিনী এই অভিযানকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করেছিল। পুলিশ এটিকে ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এটিকে ‘অপারেশন ক্যাপচার শাপলা’ হিসাবে উল্লেখ করেছিল। এর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের সম্পৃক্ততাও উল্লেখযোগ্য ছিল।
![]() |
| শাপলা অভিযানে নিয়োজিত বাহিনী (সারণী-১) |
বাংলাদেশের তৎকালীন আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ প্রায় ৮৮,০০০ জন বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে ৮৩টি ফৌজদারি মামলা দায়ের করে, যার মধ্যে ৩,৪১৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং ৮৪,৭৯৬ জনের নাম অজ্ঞাত।
তবে ফরেনসিক বা বিচার বিভাগীয় তদন্তের অভাবে শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের সঠিক মৃত্যুর সংখ্যা এখনো অজানা। কিন্তু গবেষকেরা বলছেন যে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কর্তৃক পরিচালিত তথ্য-অনুসন্ধান প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে যে ৫-৬ মে ২০১৩ তারিখে শাপলা চত্বরের ঘটনায় কমপক্ষে ৫৮ জন নিহত হয়েছিল। তবে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
![]() |
| শাপলা অভিযানে ব্যবহৃত গোলাবারুদ (সারণী-২) |
অধিকারের তথ্য-অনুসন্ধান প্রতিবেদনে শাপলা চত্বরের নৃশংসতায় ৬১ জন নিহতের তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। সম্প্রতি হেফাজতে ইসলাম শাপলা চত্বরের ঘটনায় নিহত ৯৩ জনের নামের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এছাড়াও অজ্ঞাত মৃতদেহের দাফনের সংখ্যার উপর ভিত্তি করে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলি শাপলা নৃশংসতায় নিহতের সংখ্যা অনুমান করেছে।
আরেকটা ব্যাপার পেপারটিকে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আঞ্জুমান-এ-মফিদুল ইসলামই বাংলাদেশে একমাত্র প্রতিষ্ঠান যা অজ্ঞাত মৃতদেহ দাফন করে। জুলাই ২০১০ থেকে অক্টোবর ২০১৪ পর্যন্ত দাফন করা অজ্ঞাত মৃতদেহের তথ্য বিশ্লেষণ করে, গবেষণায় এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে ২০১৩ সালের মে মাসে ২২৯টি অজ্ঞাত মৃতদেহ দাফন করা হয়েছিল।
![]() |
| শাপলা গণহত্যায় নিহতের রিপোর্টকৃত সংখ্যা (সারণী-৩) |
২০১৩ সালের মে মাস বাদে জুলাই ২০১০ সালে সবচেয়ে কম সংখ্যক অজ্ঞাত মৃতদেহ (৫০টি) পাওয়া গেছে, যেখানে নভেম্বর ২০১২ সালে সবচেয়ে বেশি (১৪৫টি) পাওয়া গেছে। ২০১৩ সালের পরবর্তী এগারো মাসে মোট ১,০৬৩টি মৃতদেহ দাফন করা হয়েছে, অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৯৬টি মৃতদেহ। এই পরিসংখ্যান থেকে বুঝা যায় যে শাপলা চত্বরের নৃশংসতার মাসে (৩৬৭টি) প্রায় চারগুণ বেশি মৃতদেহ দাফন করা হয়েছিল। প্রতিবেদন অনুসারে, শাপলা গণহত্যায় কমপক্ষে ৩১৭ জন নিহত হন।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ১৪ মে, ২০১৩ তারিখে আল জাজিরা ঢাকায় ১৪টি অজ্ঞাত মৃতদেহ দাফনের ঘটনা প্রকাশ করে, যা প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা গোপন করার প্রচেষ্টার প্রমাণ দেয়।
অধিকারের ৬১টি মৃত্যুর ঘটনা অনুসারে, নিহতদের আনুমানিক গড় বয়স ছিল ২৯.০৬ বছর। আর সকলে ছিলেন ১১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন তরুণ (৬৪.৪%), যাদের বয়সসীমা ১১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। সেখানে উল্লিখিত নথি অনুসারে, মৃত্যুর প্রায় ৮৫% ঘটনা ঘটেছে গুলিবিদ্ধ হয়ে।
উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হল, অনেকের ধারণা ছিল শাপলা আন্দোলন মূলত মাদ্রাসা শিক্ষক- এবং ছাত্র-কেন্দ্রিক ছিল। তবে রিপোর্টে এর বিপরীত কথা বলা হয়েছে। সেখানে দেখানো হয়েছে যে ৮০% মৃত ব্যক্তিই মাদ্রাসা-বহির্ভূত ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, নিহতের একজন রেহান আহসান ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র। রেহান কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, এমনকি হেফাজতে ইসলামের সদস্যও ছিলেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসলামের বিরুদ্ধে অবমাননাকর বিষয়বস্তু দেখে তিনি প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন।
![]() |
| ‘অধিকার’ কর্তৃক রিপোর্টকৃত নিহতদের পেশা (সারণী-৪) |
কিন্তু এই ঘটনাগুলো সেসময়ে ঠিকভাবে প্রকাশ করেনি বা করতে পারেনি কোনো মিডিয়া। গবেষণাপত্রটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে ২০১৩ সালের ৬ মে ভোরবেলায় সরকারি অভিযানের সরাসরি সম্প্রচারের সময় দুটি স্বাধীন টেলিভিশন চ্যানেল (দিগন্ত টেলিভিশন এবং ইসলামিক টেলিভিশন) বন্ধ করে দেওয়া হয়।
দৈনিক আমার দেশ এবং দৈনিক ইনকিলাবও সরকারের দমন-পীড়নের মুখোমুখি হয়। সাংবাদিকরা সেন্সরশিপের সম্মুখীন হন। এরপর অধিকারের সচিব আদিলুর রহমান খানকে হতাহতের প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য গ্রেপ্তার করা হয়। গত এক দশক ধরে কোনো বিচারিক তদন্ত শুরু হয়নি। মানবাধিকার সংস্থাগুলির অনুরোধ সত্ত্বেও, হাইকোর্ট কোনও সাড়া দেয়নি।
অবশেষে ২০২৪ সালে সরকারের পতনের পর হেফাজতে ইসলাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং অন্যদের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যার’ অভিযোগ এনে একটি মামলা দায়ের করে।
![]() |
| শাপলা ম্যাসাকারে মৃত্যুর কারণ (সারণী-৫) |
এই গবেষণায় উপস্থাপিত প্রমাণগুলো প্রমাণ করে যে শাপলা চত্বরের নৃশংসতা আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড অনুসারে মানবতাবিরোধী অপরাধ। সরকারের সর্বোচ্চ স্তরে অনুমোদিত একটি পরিকল্পিত এবং পদ্ধতিগত আক্রমণের প্রতিফলন ঘটে প্রায় ৭,৫০০ আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তার সমন্বিত মোতায়েন, ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নকরণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত করা, তাজা গোলাবারুদের ব্যবহার এবং নিরস্ত্র বেসামরিক বিক্ষোভকারীদের টার্গেট কিলিং এর মাধ্যমে।
সাধারণ নাগরিকদের ‘গণহত্যা’
যেকোনো রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হত্যাকাণ্ডের মতো শাপলা চত্বরে হতাহতের সঠিক সংখ্যা হয়তো কখনোই পুরোপুরি জানা যাবে না। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ দাবি করেছিল যে কোনো বিক্ষোভকারী নিহত হয়নি। শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে বলেছিলেন যে, মানুষ লাল রং ব্যবহার করে মৃত সেজেছিল এবং পুলিশ এলে পালিয়ে গিয়েছিল। সরকারিভাবে নিহতের সংখ্যা জানানো হয়েছিল ১১ জন।
অন্যদিকে হেফাজতে ইসলামের নেতারা প্রথমে দাবি করেছিলেন যে ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ জন নিহত এবং প্রায় ১০,০০০ আহত হয়েছেন। এই গবেষণায় উপস্থাপিত সমস্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই উপসংহারে আসা যেতে পারে যে শাপলা চত্বরের নৃশংসতায় অন্তত ৯৩ থেকে ৩০০ জন মারা গিয়েছেন।
[ad3]
মানবতাবিরোধী অপরাধ
গবেষকেরা বলছেন, শাপলা চত্বরের নৃশংসতাকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের ‘ব্লাড অন দ্য স্ট্রিটস’ প্রতিবেদনে হত্যার নিন্দা জানালেও একে সরাসরি মানবতাবিরোধী অপরাধ বলতে দ্বিধা করেছে। তবে একই বছর ১৪ আগস্ট মিশরের রাবা আল-আদাবিয়া স্কয়ারে অনুরূপ একটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল, যাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছিলে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দাবি করে যে শাপলায় অন্তত ৫৮ জন এবং রাবায় ১,১০০ জনের বেশি নিহত হয়েছে। তবে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ আখ্যা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রাণহানির সংখ্যার চেয়ে আক্রমণের ধরণ এবং উদ্দেশ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারই মানবতাবিরোধী অপরাধের মূলে থাকে এবং এই ক্ষেত্রে সেই সীমা অতিক্রম করা হয়েছিল এবং ডেভিড লুবান মানবতাবিরোধী অপরাধের যে পাঁচটি বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছিলেন শাপলা হত্যাকাণ্ডে এই পাঁচটি বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান।
নিবন্ধটির প্রভাব
শাপলা ম্যাসাকারের মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন। এই প্রবন্ধটি দুইভাবে আইনি প্রক্রিয়ায় অবদান রাখতে পারবে। প্রথমত, এটিতে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে হতাহতের সংখ্যা নথিভুক্ত ও বিশ্লেষণ করেছে। দ্বিতীয়ত, এটি প্রমাণ করে যে কীভাবে এই ঘটনাগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্তর্ভুক্ত। এক্ষেত্রে যারা ক্ষমতার শীর্ষে থেকে এই অপরাধ পরিচালনা বা সহায়তা করেছিল, তাদের ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ এর আওতায় তদন্ত ও বিচারের মুখোমুখি করা উচিৎ।
[ad2]
ম্যাসাকারের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
এই ধরনের ঘটনার বহুমুখী প্রভাব রয়েছে। ব্যক্তিগত স্তরে এ ধরনের ঘটনা তীব্র মানসিক চাপ (Acute stress reaction), পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD), বিষণ্নতা, ভয়, উদ্বেগ এবং শারীরিক অসুস্থতা তৈরি করে। এই ট্রমা বা মানসিক আঘাত এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মেও স্থানান্তরিত হতে পারে, যা শিশুর আচরণ ও বেড়ে ওঠায় প্রভাব ফেলে। সামাজিক স্তরে এটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে যা মানসিক সুস্থতাকে ব্যাহত করে। এটি সমাজে ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কিত আদর্শিক সংঘাতও তৈরি করে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমন ঘটনা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের ইঙ্গিত দেয়, যার ফলে একজন নাগরিকের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে।
[Labelbox label="Bangladesh" limit="3" type="grid"]
২০১৩ সালের শাপলা চত্বরে সংঘটিত গণহত্যা বাংলাদেশে নিরস্ত্র আমজনতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট সহিংসতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ঐদিন সংঘটিত বিক্ষোভকে কেবল মাদ্রাসা-চালিত আন্দোলন হিসেবে চিত্রিত করার প্রচলিত বর্ণনার বিপরীতে এই গবেষণা তুলে ধরে যে ভুক্তভোগীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলেন বিভিন্ন স্তরের সাধারণ ধর্মপ্রাণ নাগরিক, যারা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার চেয়ে ধর্মীয় আবেগের কারণে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন।
জনতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, আইনি মূল্যায়ন এবং বিদ্যমান নথিপত্র পর্যালোচনার ভিত্তিতে গবেষকেরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে রাষ্ট্রীয় এই নৃশংসাটি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ এর আইনি মানদণ্ড অনুসরণ করে।
চারজন গবেষক যে প্রতিবেদনটি সামনে এনেছেন সেটিকে তদন্ত বিভাগের আমলে নেওয়া উচিৎ। এই প্রতিবেদনটি একটি ঐতিহাসিক ডকুমেন্ট হিসেবেও সংরক্ষিত থাকবে বলে আশা করি।