>
আপনার ব্র্যান্ডের প্রচার করুন আমাদের সাথে।
![]() |
| ট্রাম্পকে কড়া জবাব: তালেবানের শক্তির উৎস কী? |
~ সমসাময়িক রাজনীতি - ৬ ~
ট্রাম্পকে কড়া জবাব: তালেবানের শক্তির উৎস কী?
.
অ্যামেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ২০২১ সালে আফগান যুদ্ধে ফেলে আসা সমরাস্ত্রগুলো ফেরত চেয়েছে যেগুলো পালিয়ে যাওয়ার সময় তারা ফেলে রেখে যেতে বাধ্য হয়েছিলো। জবাবে তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেছেন, -
“কেউ যেন ভাবেও না যে তারা আফগানিস্তানকে কোনো আদেশ দিতে পারে, আমরা আর কোনো দেশের নিয়ন্ত্রণ বা প্রশাসনের অধীনে নেই। আমেরিকান বাহিনী যে অস্ত্রগুলো ফেলে গেছে, তা এখন আফগান জনগণের সম্পত্তি। অ্যামেরিকানদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রগুলো যুদ্ধে প্রাপ্ত মাল এবং আফগান জনগণের আইনগত অধিকার। যদি কেউ এগুলো আমাদের কাছ থেকে নিতে চায়, আমরা সেই অস্ত্রগুলো দিয়েই তাদের প্রতিক্রিয়া জানাবো।"
.
তালেবানের এই প্রতিক্রিয়া শক্তিশালী একটি রাজনৈতিক অবস্থানকে ফুটিয়ে তুলেছে, যা তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতার প্রতি দৃঢ়তা প্রকাশ করে। আসুন তালেবানের জবাবি প্রতিক্রিয়ার উপর একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করা যাক, কী আছে জাবিহুল্লাহ মুজাহিদের জবাবে?
• এটি একটি স্পষ্ট বার্তা যে, তালেবান সরকার যে কোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপ বা চাপ থেকে স্বাধীন।
• অ্যামেরিকার ফেলে যাওয়া অস্ত্রগুলোকে তালেবানের বিজয় ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
• যুদ্ধলব্ধ সম্পদ যে আফগানের বৈধ সম্পদ তা বলার মাধ্যমে ট্রাম্পের দাবি অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে।
• খুবই বিচক্ষণতার সাথে প্রচ্ছন্নভাবে অ্যামেরিকার কথিত "War on Terror” কে অপরাধ হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়েছে। যেখানে আফগানে অ্যামেরিকার উপস্থিতিই ছিল অপরাধ।
• যে কোনো ধরনের খবরদারির বিরুদ্ধে দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসের সাথে হুমকি প্রদান করা হয়েছে “যদি অপচেষ্টা চালাও তাহলে প্রতিহত করা হবে”।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথার বিপরীতে তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদের এমন কড়া জবাব দেওয়া কীভাবে সম্ভব হলো? আমরা কিছু প্রশ্ন করে দেখি -
• তালেবান সরকার কীভাবে সুপার পাওয়ার অ্যামেরিকার মুখের উপর এমন কড়া জবাব দেয়ার সাহস পেল?
• প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সামরিক শক্তি, রাজনৈতিক অবস্থান এবং অর্থনীতি—কোনো দিক থেকেই আফগানিস্তান অ্যামেরিকার সাথে তুলনীয় নয়, তারপরও কীভাবে এমন জবাব দেয়া সম্ভব হলো?
.
প্রশ্ন দু’টির উত্তর যদি আমরা প্রকৃতভাবে উপলব্ধি করতে পারি তাহলে বিগত শতাব্দী ধরে বিশ্ব পরিমন্ডলে মুসলিমদের দুর্দশার মূল কারণও আমরা উপলব্ধি করতে পারবো। পাশাপাশি সামগ্রিক পরাজয় কাটিয়ে ওঠার উপায় কী?—তাও আমাদের কাছে স্পষ্ট হবে।
.
কথিত পরাশক্তি অ্যামেরিকার চোখে চোখ রেখে এমন নির্ভীক জবাব কোনো বায়বীয় আদর্শ থেকে আসেনি। এমন কড়া জবাব কোনো জায়ান্ট ইকোনমিক সিস্টেমের সাপোর্ট কিংবা মিলিটারি মাইট থেকেও আসেনি। এটা এসেছে তাদের আদর্শ এবং বিশ্বাস থেকে যা তারা হৃদয়ে লালন করে। তাদের এই আদর্শ বা বিশ্বাসের উৎস দুনিয়াবি কিংবা মানুষের তৈরি কোনো উৎস নয়। এই আদর্শ কারো অনুকরণে গড়ে ওঠা কিংবা পশ্চিমাদের থেকে ধার করা আদর্শ নয়। এই আদর্শ ওহী ভিত্তিক, যা আসমানের উপর থেকে এসেছে। সমস্ত সৃষ্টি জগতের মালিক এক আল্লাহ'র পক্ষ থেকে এসেছে। এই আদর্শ চিরন্তন এবং অপরিবর্তনীয়। এই ওহী ভিত্তিক আদর্শই তাদেরকে শিক্ষা দেয়—যে কেউ তাদের দেশে আক্রমন করতে চাইলে, তাদের সম্পদ লুটে নিতে চাইলে, তাদের নারী শিশুদের হত্যা করতে উদ্যত হলে,-
- কেমন জবাব দিতে হয়।
- কীভাবে দিতে হয়?
- কেন দিতে হয়?
- তারা সফল হলয়ে কী হবে?
- তারা ব্যর্থ হলে কী হবে? —এ সবকিছু তাদের জন্য ওহীভিত্তিক আদর্শ থেকে নির্ধারিত।
.
অপরদিকে যারা তাদের হুমকি দিতে চায় তাদের আদর্শ হলো মানব রচিত। যখন ওহী ভিত্তিক এবং মানব রচিত দু্’টি আদর্শ কোনো “আদর্শিক দ্বন্দের” মুখোমুখি হয় তখন মানব রচিত আদর্শের পরাজয় সুনিশ্চিত হয়ে যায়। এই পরাজয় তখন কিছু সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
.
বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য বিগত তিন দশকের বাস্তব পরিসংখ্যানকে আমরা সামনে রাখতে পারি। খেয়াল করে দেখুন, অ্যামেরিকা আফগানের মাটিতে আগ্রাসন চালিয়েছে পরপর আগত তিন প্রেসিডেন্টের শাসনামলে। প্রতিটি প্রেসিডেন্টের আমলে তালেবানদের আদর্শগত অবস্থান একই ছিল। আদর্শের প্রশ্নে তারা না আপোষ করেছে, না কিছু সংযোজন বা বিয়োজন করেছে। ক্ষমতা লাভের আগে তালেবান যে আদর্শের উপর লড়েছিলো ক্ষমতা লাভের পর সেই আদর্শের উপরই অবিচল আছে। অথচ ইউক্রেন ইস্যুতে বাইডেনের অবস্থান ট্রাম্পের আমলে বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এক প্রেসিডেন্টের আদর্শকি অবস্থান এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো অন্য প্রেসিডেন্টের আমলে ভুল হিসেবে দেখা হয়। এমনটি মানব রচিত আদর্শের কারণেই হয়। কেননা তাদের আদর্শ কখনোই মৌলিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারে না, পারবে না। এভাবেই মানব রচিত পশ্চিমা আদর্শ দুনিয়াতে বিপর্যয় ডেকে আনে। আর এই আদর্শের ধারক-বাহক এবং অনুসারীরা চূড়ান্তরূপে পরাজিত হয়।
.
যদিও আমরা একটিমাত্র উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করেছি, কিন্তু বাস্তবতা হলো আপনি আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এমন অসংখ্য উদাহরণ খুঁজে পাবেন। আপনারা এই দু’টি আদর্শকে সামনে রাখুন, অতঃপর নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আদর্শিক দ্বন্দের জায়গাগুলো বোঝার চেষ্টা করুন। তাহলে এটি সবার কাছে স্পষ্ট হবে যে, সামগ্রিক বিপর্যয় এবং পরাজয়ের মূল কারণই হলো আদর্শিক বিচ্যূতি, অন্য কিছু নয়।
.
ঠিক এই বাস্তবতাই আমরা আমাদের দেশেও দেখতে পাই। বিগত দশকগুলোতে কীভাবে আমরা ভারতীয় আগ্রাসনে শিকার হয়েছি, কীভাবে হিন্দুত্ববাদীদের হাতে শোষিত হয়েছি—তা আজ কারো কাছে অজানা নয়। এটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, ১৯৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পেছনে ভারতের ভূমিকা ছিল তার ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে। তবে, এই ভূমিকার প্রসঙ্গ ভারত সবসময় যেভাবে ফলাও করে ঠিক তেমনি বাংলাদেশকে নিয়ে তাদের “Deep State Plan” এর বিষয়টি গোপন রাখতে চায়। এই গোপন পরিকল্পনা একটি ওপেন সিক্রেট, যা ১৯৭১-এ বাংলাদেশের জন্য নেওয়া ভারতের প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে দুইটি বিশেষ উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে –
- ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতের যাবতীয় স্বার্থ চূড়ান্তভাবে রক্ষা করা।
- গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে সম্পূর্ণরূপে ভারত নিয়ন্ত্রিত একটি ভূমিতে পরিণত করা।
.
ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর ভারতীয় শোষণের এই দীর্ঘ ইতিহাসে হঠাৎ বাধা তৈরি হয়েছে, তাদের সমস্ত ষড়যন্ত্র ব্যাকফুটে চলে গেছে সত্য, কিন্তু অ্যামেরিকা শোষণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এদের শোষণের নীতিই হলো নির্দষ্ট কোনো ভূ-খন্ডে প্রথমে তাদের বিচ্যূত আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে শোষণের পথ সুগম করা। আমাদের বুঝতে হবে বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো আসলে কেন চায় প্রতিটি রাষ্ট্র তাদেরই বেঁধে দেয়া মানব রচিত আদর্শের উপর চলুক? এখানে মূল একটি মেকানিজম হলো, গণতান্ত্রিক আদর্শের মডেল এমনভাবেই সাজানো হয়েছে যেখানে প্রতিটি দুর্বল রাষ্ট্র অন্য এক বা একাধিক সবল রাষ্ট্রের দাসত্ব করতে বাধ্য হবে। এই মেকানিজমের কারণেই স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে এসেও বাংলাদেশ ভারতের দাসত্ব করে চলেছে। যেহেতু যুদ্ধ হয়েছিলো গণতান্ত্রিক আদর্শের উপর এবং এই আদর্শকেই প্রতিষ্ঠিত করার জন্য, সেকারণে ভারতের প্রতিটি দাবিদাওয়া আজও পূরন করে চলেছে বাংলাদেশ।
.
এই বাস্তবতাই মূলত তালিবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে যা আমরা উপরে স্পষ্ট করেছি। কোনো জাতির আদর্শিক অবস্থানই মূলত এটা নির্ধারণ করে দেয় যে, তারা কথিত পরাশক্তিগুলোর চোখ রাঙ্গানোকে উপেক্ষা করতে পারবে নাকি তাদের গোলামী করতে বাধ্য হবে।
.
তাই ভাবার বিষয় হলো, আমরা পশ্চিমাদের তৈরি করা মানব রচিত আদর্শের অনুসরণে আমাদের দাসত্ব, লাঞ্ছনা এবং পরাজয়ের ইতিহাসকে কি আরও দীর্ঘায়িত করতে যাচ্ছি? যেখানে কখনো অ্যামেরিকার আবার কখনো চীন কিংবা ভারতের দাসত্ব করাই হবে দ্বিতীয় স্বাধীনতার প্রাপ্তি?
...
#সমসাময়িক_রাজনীতি