>
আপনার ব্র্যান্ডের প্রচার করুন আমাদের সাথে।
![]() |
| ~ জুলাই গণহত্যায় জাতিসংঘের অনুসন্ধান দলের প্রতিবেদন প্রকাশ ~ |
জুলাই, ২০২৪। অধিকার আদায়ের আন্দোলনে উত্তাল সমগ্র বাংলাদেশ। নিরস্ত্র ছাত্রজনতাকে দমন করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে নৃসংশ ভূমিকায় নেমে আসে রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং দলীয় সন্ত্রাসীরা। কখনো হেলিকপ্টার, কখনো স্নাইপার আবার কখনো আধুনিক মারণাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আন্দোলনরত সাধারণ ছাত্র-নাগরিকদের উপর। পতিত ফ্যাসিস্ট সরকার প্রধান শেখ হাসিনা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে সারাদেশ জুড়ে শুরু হয় নির্বিচার গণহত্যা। অধিকার আদায়ের আন্দোলন রূপ নেয় সরকার পতনের ১ দফা আন্দোলনে, ছাত্র আন্দোলন রূপ নেয় গণঅভ্যূত্থানে।
.
শুরুতে রাষ্ট্রযন্ত্র নৃসংশ গুম-খুনের বিষয় গোপন করার চেষ্টা করলেও তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি; বরং বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নারকীয় হত্যাযজ্ঞের তথ্য-উপাত্তগুলো পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এমন হত্যাযজ্ঞ চালিয়েও সরকার পতনের আন্দোলনকে দমানো যায়নি। তীব্র প্রতিরোধের মুখে গতবছর ৫ আগস্ট দেশ ও ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যায় শেখ হাসিনা। অন্তবর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই জুলাই-আগস্ট গণহত্যার ঘটনা তদন্তে আহ্বান জানায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনকে। বাংলাদেশে এসে দীর্ঘ অনুসন্ধান চালায় স্বাধীন এই অনুসন্ধান দলটি, যার উপর ১১৪ পাতার খসড়া একটি প্রতিবেদন ১২ ফেব্রুয়ারী জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই-কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
▪️ যেভাবে তৈরি করা হয় এই প্রতিবেদন
.
মোট ১৬ টি বিষয়ের উপর তথ্য সংগ্রহ করার জন্য দেশের ৮ টি বড় শহরে অনুসন্ধান চালায় দলটি। বিভিন্ন পর্যায়ে অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল –
• আন্দোলনে আহত-নিহতদের পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী, মানবাধিকার কর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, আইনজীবী, ব্যবসায়ীসহ সামরিক ও আধা-সামরিক কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে কথা বলা।
• বিভিন্ন পর্যায়ে ২৩০ টি গোপনীয় এবং বিস্তারিত সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা।
• বিশ্লেষণ করা হয় ১৫৩ টি মেডিকেল কেইস ফাইল
• এক হাজারের অধিক ছবি, ভিডিও ও রেকর্ড সম্বলিত ফাইল এবং
• ৯৫৯ টি এমন তথ্য-প্রমাণ যা জনসাধারণ এবং বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছিলো।
▪️ এক নজরে নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পরিসংখ্যান
.
প্রতিবেদন অনুসারে, জুলাই আন্দোলনে মোট ১৪০০ নিহতের তথ্য পাওয়া গেছে যেখানে ১২ শতাংশই ছিল শিশু, যাদের অধিকাংশ তাদের বাড়িতে অবস্থানের সময় টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছে। গুরুতর আহত হয়েছে ১৩,৫২৯ জন এবং র্যাব ও পুলিশের হাতে আটক হয়েছে ১১,৭০২ জন। প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে -
• ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আবু সাঈদ হত্যাকান্ড,
• ১৭ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তিপূর্ণ শিক্ষার্থী সমাবেশে নারকীয় হামলা,
• ১৮ জুলাই উত্তরাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড,
• ১৯ জুলাই বাড্ডা-রামপুরা হত্যাকান্ড এবং
• ১৬-২১ জুলাই যাত্রাবাড়ী ম্যাসাকার বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
.
এছাড়াও প্রতিবেনটিতে উঠে এসেছে যৌন হয়রানিমূলক তথ্য। বিক্ষোভের প্রথম দিকে নারীরাও আওয়ামী মদদপুষ্ট নিরাপত্তা বাহিনী এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী ও সমর্থকদের দ্বারা হামলার শিকার হয়। যেগুলোর মধ্যে রয়েছে লিঙ্গভিত্তিক শারীরিক সহিংসতা, ধর্ষণের হুমকি এবং যৌন নির্যাতনের ঘটনা। অভিযোগ আছে, প্রতিশোধমূলক সহিংসতা হিসাবে ধর্ষণের হুমকি প্রদান এবং যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটানো হয়। এমনকি সহিংসতা উস্কে দিতে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং ব্যবসাকেন্দ্রেও ধ্বংসযজ্ঞ চালায় আওয়ামী প্রেতাত্মারা। আর এসব কিছুই ঘটেছে পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আওয়ামীপন্থী নেতা-কর্মীদের পরিকল্পনা, সমন্বয় এবং নির্দেশনায়।
.
▪️ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন
.
NSI, DGFI এবং CTTC, DB, RAB এর মতো সরকার পরিচালিত গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অভ্যূত্থান দমনে সরাসরি সহিংস কার্যক্রমে সমর্থন ও যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। যেটাকে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও, স্পর্শকাতর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও প্রচার না করার জন্য সাংবাদিক এবং সংবাদ মাধ্যমকে হুমকিও প্রদান করেছিলো সংস্থাগুলো। টার্গেট কিলিংয়ের জন্য রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোকে নিয়মিত তথ্য প্রদান করেছিলো তারা।
.
▪️ সাংবাদিক হত্যা ও নিপীড়ন
.
১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে কমপক্ষে ৬ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে এবং আহত হয়েছে প্রায় ২০০ জন। কয়েকজন নারী সাংবাদিক আওয়ামী গুন্ডাবাহিনীর হাতে নিপীড়ন এবং হুমকির শিকার হয়েছেন বলেও প্রমান পাওয়া গেছে।
.
▪️ চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের সুপারিশ
.
জাতিসংঘের অনুসন্ধান দলটি জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার, পুলিশ ও নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার এবং রাজনীতি ও অর্থনীতিসহ প্রায় অর্ধশত সুপারিশ দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো –
• সমস্ত বিচার বহির্ভূত হত্যা, গুমের তদন্ত এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনে অভিযুক্তদের শাস্তিপ্রদানে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
• নাগরিক নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিশ্চিতে র্যাব এবং National Telecommunication Monitoring Centre (NTMC) এর বিলুপ্তি ঘটনো এবং
• অন্যান্য আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরা।
▪️ কিছু স্মৃতি ফিরে আসবে কি? কিছু ক্ষত শুকাবে কি কখনো?
.
পুরো প্রতিবেদনে বিভিন্ন দিক থেকে সুবিচারের সুপারিশ করা হয়েছে। নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে নাগরিক অধিকার ও অপরাধীদের জবাবদিহিতা। কিন্তু এতোকিছুর পরও আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর নৃশংসতার কিছু ছাপ মুছে যাবে কি কখনো? ফেরানো যাবে কি কিছু স্মৃতি? প্রতিবেদনের ধারাবাহিক আলোচনার বাহিরে আমরা আপনাদের সামনে এমন কিছু হৃদয়বিদারক ঘটনা তুলে ধরতে চাই যার ক্ষত কখনো শুকাবে না, কোনো কিছুতেই যার ক্ষতি পোষানো যাবে না। ১৯ জুলাইয়ে ঘটে এমনই দুইটি ঘটনা যা পাষাণ হৃদয়কেও নাড়িয়ে দেয় -
• সময় আনুমানিক বিকেল ৪ টা। যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ এলাকায় কোটা আন্দোলন নিয়ে চলছে সংঘর্ষ। ৮ তলা বাসার বারান্দায় বাবা-মায়ের সাথে দাঁড়িয়ে তা দেখছিল চার বছরের ছোট্ট আব্দুল আহাদ। হঠাৎ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বারান্দার রেলিং ছেড়ে লুটিয়ে পড়ে আহাদ। বাবা-মা তাকে ধরতেই আঁতকে ওঠেন। দেখতে পান, সন্তানের ডান চোখ ভেদ করে মাথার ভেতরে কিছু একটা চলে গেছে, চোখ দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে। দ্রুত নিচে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলে বাধা দেয় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। পরবর্তীতে হাসপাতালে নিতে পারলেও আহাদকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। দু’চোখ ভরা ভয়, যন্ত্রণা আর হয়তো একরাশ ঘৃণা নিয়ে মারা গেছে ছোট্ট আহাদ।
• বাড়ির সামনে খেলাধুলার জায়গা না থাকায় অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও ছাদে খেলছিলো ৬ বছরের রিয়া গোপ। হঠাৎ ভবনের নিচে ও চারপাশে হইচই, চিৎকার চেঁচামেচি আর গুলির শব্দ শুনে মেয়েকে ঘরে আনতে দৌড়ে ছাদে যান তার বাবা। মেয়েকে কোলে তুলে নিতেই বুলেট এসে বিদ্ধ হয় রিয়ার মাথায়, মুহূর্তেই ঢলে পড়ে বাবার কোলে। রক্তে ভিজে যায় পুরে শরীর। অতঃপর হাসপাতালে ৬ দিন চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে মারা যায় মেয়েটি।
.
প্রতিবেদনটি নিয়ে কাজ করার সময় কিছু কিছু জায়গায় এসে আমরাও স্তব্ধ হয়ে গেছি। হঠাৎ করে থেমে গেছে কীবোর্ডের খটখট আওয়াজ, নৃশংসতার বর্ণনাগুলো ঝড় বইয়ে দিয়েছে চিন্তার জগতে! কখনো মনে হয়েছে, এটি হয়তো কাশ্মীরে আগ্রাসী ভারতের নিপীড়ন! কখনো মনে হয়েছে, না! না! এটি তো আরাকানের ম্যাসাকার। আবার কখনো বা নিজ ভূমিতে ফিলিস্তিনিদের উপর চলমান নিপীড়নের দৃশ্য মনে হয়েছে।
▪️ফ্যাসিবাদের মসনদের কাছে আমাদের জীবন ছিল মূল্যহীন
.
আপনি কি জানেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি বাহিনী চরম নৃশংসতা নিয়ে কেন একযোগে মাঠে নেমেছিলো? তাদের উদ্দেশ্য ছিল জনমনে ভীতি তৈরি করা, যেন আন্দোলন অভ্যূত্থানে রূপ না নেয়। কী অদ্ভূত তাই না! জালিমের মসনদ টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের কাছে কতই না মূল্যহীন ছিল আমার, আপনার, আমাদের জীবন। আমাদের পরিবার ও সন্তানদের রক্ত। ভীতি তৈরি করার জন্য যেখানে ফাঁকা ফায়ার করাই ছিল যথেষ্ট সেখানে সরাসরি গুলি করা হয়েছে মাথায় এবং বুকে। জি এটাই হয়েছে ৪ বছরের আহাদ, ৬ বছরের রিয়া, ১০ বছরের হোসাইন, ১১ বছরের সামির, ১৩ বছরের মোবারক, ১৪ বছরের তাহমিদ এবং ১৬ বছরের ইফাত ও নাঈমার জীবনে। শৈশব কৈশোরোর গন্ডি পেরোনোর আগেই তাদেরকে বলি হতে হয়েছে আওয়ামী নৃশংসতার।
▪️ কিছু ভাবনা থেকেই যাবে
.
এখন দেখার বিষয় হলো, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে জাতিসংঘের সুপারিশকৃত বিষয়গুলোর কতটুকু বাস্তবায়িত হয় এবং দলীয় নেতা-কর্মীসহ রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোতে থাকা আওয়ামী প্রেতাত্মাদের বিচারের আওতায় আনতে কতোটা সক্ষমতা এবং স্বচ্ছতার পরিচয় দিতে পারে এ সরকার। আমাদের ভাবার বিষয় হলো, নিজ জাতির উপর চালানো এমন নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পরও সামান্যতম অনুশোচনা কিংবা অপরাধবোধের পরিবর্তে ৩২ এর ধ্বংসাবশেষ থেকেই পতিত ফ্যাসিজমের নবজাগরণের ঘোষণা দিচ্ছে যারা, তাদের চূড়ান্ত পরিণতির জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও তার উপদেষ্টাগণ সত্যিই কি সচেষ্ট? নাকি ঘটনার আড়ালে কৌশলে অপরাধীদের পুনর্বাসনের ষড়যন্ত্র পাকাপোক্ত করা হচ্ছে?
-----