>
আপনার ব্র্যান্ডের প্রচার করুন আমাদের সাথে।
আমাদের ভূখণ্ড আজ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে পৃথিবীর ৩য় বৃহত্তম শরণার্থী ধারণকারী ভূখণ্ড হিসাবে পৃথিবীর বুকে পরিচিতি লাভ করেছে। যে অসহায় শরণার্থীদের বড় একাংশ '১৭ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করেছিলেন।
![]() |
| রোহিঙ্গা শরণার্থী: বাংলাদেশের বোঝা নাকি কৌশলগত সম্পদ? |
সেবার বাংলার মাটিতে আশ্রয়ের খোঁজে আগমন করা রোহিঙ্গা শরণার্থীরা সংখ্যার হিসাবে ছিলেন ৭,০০০০০ মানুষ। যাঁরা বাংলাদেশে আগমনের পর বাংলার মানুষ তাঁদের নিজেদের আপন হিসাবে গ্রহণ করে নেন। নিজ পরিবারের অংশের ন্যায় তাঁদের নিজেদের কাছে টেনে নেয় আমাদের বাংলার জনপদ। ভারতের দৃষ্টিকোণ হতে যা তখন আমাদের ভূখণ্ডে ওদের ভবিষ্যৎ তৎপরতার জন্য চরম হুমকি বলে বিবেচিত হয়।
আরো সামনে অগ্রসর হওয়ার পূর্বে আমাদের কিছু বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার হওয়া দরকার। যেগুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো।
০১| রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশে আগমনের পর তাঁদের আশ্রয়ের স্থান, বিশেষ করে চট্টগ্রামের দিকে অপরাধ বৃদ্ধি পাওয়া ও সেখানে রোহিঙ্গা অপরাধীদের অংশগ্রহণ।
০২| তাঁদের তুলনামূলক কম শিক্ষা ও নগর জীবনের সংস্পর্শ হতে দূরত্বের ফলে বাংলাদেশের মাঝে তাঁদের শিবিরের সংস্পর্শে থাকা অনেকের চোখে তাঁদের দৃষ্টিকটু নানান আচরণ।
উপরোক্ত বিষয়ে আলোচনার শুরুতে আমি বলতে চাই, অপরাধের সাথে রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে সংশ্লিষ্ট করার আগে আমাদের বোঝার চেষ্টা করা দরকার যে, অপরাধের পেছনে রোহিঙ্গা জাতি অথবা তাঁদের ওপর আপতিত হওয়া বর্তমান পরিস্থিতি, দুটির মাঝে আসলে কোনটি দায়ী। যা নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমরা দুনিয়ার আরো বেশ কিছু শরণার্থী জাতি ও তাঁদের আশ্রয়দাতাদের নিয়ে পড়াশোনা করেছি। যাদের মাঝে তুরস্ক ছিল অন্যতম।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে তুরস্কে শরণার্থীদের আগমন শুরু হয়েছিল ১৯৮৮ সাল হতে। যখন কুর্দিদের ওপর Iraqi Armed Forces নারকীয় Anfal Campaign লঞ্চ করে। যা প্রচণ্ড বিধ্বংসী ও বিস্তৃত আকারের Counter-Insurgency (COIN) তৎপরতা হিসাবে তখনকার পৃথিবীর বুকে পরিচিতি পায়। দীর্ঘমেয়াদে যা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র পরিবর্তনে বিশাল অবদান রাখতে সমর্থ হয়েছে। তবে তা ভিন্ন প্রসঙ্গ।
কুর্দিরা যখন বাগদাদের সামরিক অভিযানের ফলে নিজেদের জনপদ হতে বেরিয়ে তুরস্কের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে শুরু করেন, তখন শরণার্থী শিবিরের মানবেতর পরিস্থিতি তাদের অনেক মানুষকে স্মাগলিং, মাদক পাচার, মানব পাচারের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে নিক্ষেপ করে। যে পরিস্থিতির পেছনে সর্বাধিক শক্তিশালী ভূমিকায় ছিল তুরস্কের মাফিয়া। তখন Central Intelligence Agency (CIA) এর হাত ধরে আফগানিস্তানে পপি তথা হেরোইন চাষ আকাশ ফুঁড়ে আরম্ভ হয়েছিল। কারণ, তখন পর্যন্ত সেখানে তালিবান সরকার দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়নি, যার ফলে মাদক উৎপাদন বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়ার পদক্ষেপও তখন পর্যন্ত শুরু করেনি তাঁরা। সুতরাং, আফগানিস্তান থেকে রওয়ানা হয়ে ওসব মাদক প্রথমে ইরান পাড়ি দিতো। অতঃপর নর্দার্ন ইরাক পেরিয়ে তুরস্কে আগমন করতো। পাহাড়ি গিরিপথের মাঝ দিয়ে সেসব মাদক তুরস্কে আনয়নের পেছনে মূল ভূমিকা রাখতো কুর্দি শরণার্থী শিবির হতে ভাড়া করা কুলির দল। ওখান থেকে ওসব মাদক তারপর ইউরোপের মাটিতে ছড়িয়ে পড়তো। আর আমরা সকলে জানি যে, যেখানে মাদক থাকে, সেখানে হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ সহ সকল রকমের অপরাধের জন্ম হয়। তুরস্কের মাটিতেও যার ব্যতিক্রম হয়নি।
সেখান হতে আমরা যদি ২০১১ সালে সিরিয়ান শরণার্থীদের কাছে চলে আসি, তাঁদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ছিল হুবহু অনুরূপ। সিরিয়া পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটার সাথে সাথে তুরস্কের মাটিতে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের কর্মকাণ্ড প্রচণ্ড আকার ধারণ করে। ততদিনে একদা তুর্কি মাফিয়ার হয়ে অপরাধ সংঘটনে জড়িত থাকা কুর্দিরা স্বয়ং কুর্দি মাফিয়ায় পরিণত হয়েছে। ওরা তখন যুদ্ধ হতে বাঁচতে চাওয়া সিরিয়ানদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ইউরোপ ও দুনিয়ার নানান প্রান্তে তাঁদের পাচারের মতো অপারেশন পরিচালনা করতে শুরু করেছে। অসহায় সিরিয়ান ও কুর্দি নারীদের তুলে নিয়ে পতিতালয়ে বিক্রি করে দেওয়া, জোরপূর্বক বিবাহ দেওয়া, ভিনদেশী মাফিয়ার কাছে পাচার করে দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে ওরা।
তখন কুর্দি ও তুর্কি মাফিয়া নিজেদের অপারেশনে সিরিয়ান শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দাদের ব্যবহার করতে শুরু করলো। আঁদানা, মারসিন, ইস্তাম্বুল সিটির মাদক ব্যবসায় তখন সিরিয়ান তরুণদের লাগিয়ে দেওয়া হলো৷ গাঁজিয়ান্তেপ, ইস্তাম্বুল ও মারসিনের Organized Crime Syndicate গুলো সেসময় জাল নথি-পত্র তৈরিতে সক্ষম সিরিয়ানদের নিজেদের দলে অন্তর্ভুক্ত করতে থাকে। কারণ, ওখানকার অপরাধীদের অন্যতম বিশেষত্ব ছিল জাল পাসপোর্ট ও অন্যান্য দরকারি কাগজ প্রস্তুত করা। নবাগত সিরিয়ানদের দক্ষতা যেখানে ওদের জন্য বেশ কাজের বলে প্রমাণিত হচ্ছিলো। আপনি যদি নিজেকে কখনো ইস্তাম্বুলে নথি-পত্র ছাড়া আবিষ্কার করেন, তাহলে শহরের ফাঁতিহ অঞ্চলের কিছু বিশেষ স্থানে গিয়ে আপনি সঠিক লোকের সন্ধান করে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে পারলে যথেষ্ট। ওরা আপনাকে নতুন পাসপোর্ট তৈরি করে দিবে! আবার যাঈতুনবারনুতে গেলে আপনার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হবে জাল অর্থ আর নকল তুর্কি রেসিডেন্সি পারমিট। তুরস্কের ভৌগোলিক অবস্থান আজ দেশটির মাটিতে এগুলোকে বেশ লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করেছে।
মূল কথা হলো, শরণার্থীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া কোনো জাতি ভিত্তিক সমস্যা নয়। পৃথিবীর বুকে আজ পর্যন্ত এমন কোনো শরণার্থী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে আমার জানা নাই, যে পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী অপরাধমূলক তৎপরতা সংঘটিত হয়নি। ফলে, রোহিঙ্গাদের সমষ্টিগতভাবে বিভিন্ন অপরাধের জন্য দায়ী করা আসলে তাঁদের প্রতি চরম অবিচারের নামান্তর।
আমাদের দ্বিতীয় প্রসঙ্গ ছিল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নানান সেকেলে আচরণ। শিক্ষা ও নগর জীবনের স্পর্শ হতে বঞ্চিত থাকার ফলে যার উদ্ভব হয়ে থাকে। আবারো, এটির জন্য আমরা কোনোভাবে রোহিঙ্গা জনপদের অধিবাসীদের দায়ী করতে পারি না। কারণ, তাঁরা এমন একটি ভূখণ্ডের বাসিন্দা ছিলেন, যেখানে তাঁদের নাগরিক হিসাবে ন্যূনতম স্বীকৃতি দেওয়া হতো না। ফলে শিক্ষা তো পরের বিষয়, ন্যূনতম মানবিক অধিকারের দাবি করার অধিকার তাঁদের সেখানে ছিল না। এমনকি বেঁচে থাকবার, নিয়মিত হত্যা, ধর্ষণের শিকার না হওয়ার দাবি জানাবার অধিকারও ওখানে দেওয়া হয়নি তাঁদের। ফলে, তাঁদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা ও আমাদের দৃষ্টিতে যা সভ্যতা, তার সাথে তাঁদের পরিচিত করার ব্যবস্থা করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব আজ আমাদের কাঁধে। অবশ্য নিজেকে বাংলাদেশি ও নাক উঁচু মর্মে দাবি করে তা থেকে আমাদের কেউ অব্যাহতি চাইলে সেটা আলাদা বিষয়। আসলে পৃথিবীর যেসব দেশে শরণার্থীরা গিয়েছেন, তার প্রতিটি দেশে সাধারণত অনুরূপ নাক উঁচু অসভ্যদের অস্তিত্ব সবসময় দেখা গিয়েছে।
আলোচনার শুরুতে যেসব বিষয় নিয়ে আমাদের পরিষ্কার হওয়ার কথা ছিল, তা এখানে শেষ করা হলো। এখন আমরা মূল আলোচনার দিকে ধাবিত হতে চলেছি।
রোহিঙ্গা তথা আরাকানের মুসলিমদের সাথে বাংলার মুসলিম জনপদবাসীর সহমর্মিতা, একাত্মতা পোষণ ছিল ভারতের National Security Apparatus এর চোখে চরম দূর্যোগের আগাম পূর্বাভাস। কারণ, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাথে বাংলার সাধারণ মুসলিমদের সম্পর্ক শক্তিশালী হলে আরাকানে রোহিঙ্গারা শক্তিশালী হয়ে ওঠার দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে। যে পরিস্থিতি বাংলাদেশ তথা চট্টগ্রাম অঞ্চলকে বাড়তি কৌশলগত গভীরতা প্রদান করে।
ভারত চট্টগ্রাম অঞ্চলকে, বিশেষ করে চট্টগ্রামের পাহাড়কে অস্থিতিশীল রাখতে পছন্দ করে। হয়তো অনাগত দিনগুলোতে ওরা পাহাড়ে '৭১ এর অনুকরণে Special Frontier Force (SFF) মোতায়েন করে চট্টগ্রামের পাহাড়কে নিজেদের করে নেওয়ারও পরিকল্পনা করেছে। আর বাংলাদেশ হতে চট্টগ্রামকে আলাদা করে দেওয়ার বিষয়ে ওদের যে চিন্তাধারা, তা ইতিমধ্যে ওদের নানান ব্যক্তি আর মাধ্যমের হাত ধরে প্রকাশ্য। যেখানে ফেণী অঞ্চলকে ওরা আমাদের নিজস্ব কৌশলগত দূর্বলতা মর্মে চিহ্নিত করে থাকে।
চট্টগ্রাম শহর ও পাহাড়ের মাটিতে ওদের গুপ্তচর সংস্থার Front Organization গুলো খুব শক্তিশালী আকারে সক্রিয়। আমরা '২৪ সালের নভেম্বরে ইতিমধ্যে যার ভয়ানক প্রমাণ পেয়েছি সম্মানিত সাইফুল ইসলাম আলিফের (تَقَبَّلَ اللهُ) নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাঝ দিয়ে। যেখানে আমাদের Bangladesh Army এর দেশপ্রেমিক সেনানী ও Bangladesh Police এর সদস্যদের ওপর স্বর্ণকারদের দ্বারা ব্যবহৃত অ্যাসিড পর্যন্ত নিক্ষেপ করা হয়। স্থানীয় চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের অনেকে তখন ওখানকার বিভিন্ন স্থানে হিন্দি ভাষার প্রচলনও লক্ষ্য করেছেন। তাঁরা বিভিন্ন সময়ে এমনটিও জানিয়েছেন যে, তাঁরা ওসব স্থানে মুসলিম পরিচয়ে নির্ভয়ে রাস্তায় চলাচল করার কালেও শঙ্কায় থাকেন।
সুতরাং, এমন একটি অঞ্চলের মাটিতে আচমকা লক্ষ লক্ষ মুসলিমের স্থায়ী অবস্থান নিয়ে বসে পড়া ভারতের চলমান অপারেশনের জন্য প্রচণ্ড হুমকির সৃষ্টি করে। আসলে আমার বলা উচিত, চট্টগ্রামের মাটিতে ওদের অপারেশনকে অনেকখানি ভেস্তে দেয় মুসলিম রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢলের মতো আগমন। কারণ, চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষদের মাঝে একদিন দাঙ্গা অথবা সহিংসতা উস্কে দেওয়ার পর দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অশিক্ষিত, সভ্যতা হতে দূরের, নিরূপায় কিছু মানুষকে তার মাঝে আবিষ্কার করে বসা মোটেও সুখকর বিষয় নয়। বরং সুখকর অনুভূতির পরিপূর্ণ বিপরীত পরিস্থিতি সেটা। কারণ, পরিস্থিতি তখন খুব তাড়াতাড়ি ভয়ঙ্কর দূঃস্বপ্নে পরিণত হওয়ার সক্ষমতা রাখে। বিশেষ করে যখন পৃথিবীর বুকে ওসব মানুষদের প্রতি সহমর্মিতা আর ভ্রাতৃত্বের অনুভূতি প্রদর্শনকারী একমাত্র জাতিকে কচুকাটার চেষ্টা করছো তুমি। তখন তোমার সাথে তাঁরা কি করবে, তা হয়তো তোমার কল্পনারও বাহিরে।
ফলে দিল্লি বিষয়টির নিয়ন্ত্রণ নিতে বাংলাদেশের মাটিতে ওদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সংবাদপত্র ও টেলিভিশনকে মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত নেয়। রোহিঙ্গাদের নিয়ে ওরা যেখানো সুকৌশলে জাতিগতভাবে চরম বিদ্বেষপূর্ণ কথা বলতে শুরু করে। যেমন রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের জন্মহার নিয়ে সূক্ষ্ম বিদ্বেষমূলক প্রতিবেদন করতে শুরু করে ওরা। যে পদ্ধতিটি Research & Analysis Wing (RAW) এর গুপ্তচরেরা শিখেছে তেল আবিবে Israeli Intelligence Community এর সাথে কাজ করার সময়ে গাজা উপত্যকার অধিবাসীদের ওপর ওদের ব্যবহৃত জন্মহার কেন্দ্রিক বিতর্ক কৌশলের মধ্য দিয়ে।
ওদের মূল লক্ষ্য ছিল এখানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাথে বাংলার সাধারণ তরুণ ও যুবকদের সহমর্মি হয়ে ওঠার যে পরিস্থিতি গড়ে উঠেছিল, তা রোধ করে দেওয়া। কারণ, রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশিরা একত্র হয়ে গেলে তাঁরা যখন আরাকানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার তৎপরতা আরম্ভ করবে, তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে ভারত নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করবে। ওদের তত্বাবধানে ওখানে অস্থিতিশীলতার সাথে জড়িত বাহিনীগুলো তখন দূর্বল হতে আরম্ভ করবে। আর এটা তো কেবল শুরু। বাংলাদেশিদের পৃষ্ঠপোষকতায় রোহিঙ্গা ঝড় আরাকানে শুরু হলেও এর শেষ আরাকান হবে না। রোহিঙ্গারা মিয়ানমার পরিস্থিতির বড় Stakeholder হিসাবে নিজেদের রূপান্তর করতে পারলে তখন তাঁরা ভারতের North-East এর ঘাড়ের ওপরে নিঃশ্বাস ফেলতে আরম্ভ করবে। যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশে নিজেদের থাবা বসাতে চাওয়া কোনো হায়েনার জন্য কখনো সুখকর বিষয় হতে পারে না। কিন্তু, রোহিঙ্গারা যদি আরাকান ও মিয়ানমার পরিস্থিতিতে Stakeholder এ রূপ নেয়, তাহলে সেখানে ক্ষতি শুধু ভারতের না, বরঞ্চ পৃথিবীর বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তি সেখানে ক্ষতির শিকার হবে বলে ধারণা করা হয়। ফলে, রোহিঙ্গাদের তেমন অবস্থায় পৌঁছাতে না দেওয়ার বিষয়ে ওরা সকলে সহমত পোষণ করে থাকে।
United States Army War College (USAWC) যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভ্যানিয়াতে অবস্থিত। ছাত্ররা যখন ওখানে National Security Policy নিয়ে পড়তে আরম্ভ করেন, তখন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সমাধানের বিষয় উপস্থিত হলে তাদের সর্বপ্রথম আলোচ্য পরিস্থিতিতে জড়িত অংশীদার সকল রাষ্ট্র ও গোষ্ঠী সমূহকে সবার আগে চিহ্নিত করতে শেখানো হয়। যার পরবর্তী অংশে করণীয় হয় পরিস্থিতির মাঝে ওসব অংশীদারদের স্বার্থ কি তা চিহ্নিত করা। তবে, তার পূর্বে চলমান পরিস্থিতির বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের পক্ষের কতখানি গুরুত্ব বা মূল্য রয়েছে, তা যাচাই করতে বলা হয় তাদের।
আরাকান পরিস্থিতিতে চীন, ভারত, বাংলাদেশের মতো বিভিন্ন শক্তি সেখানে State Actor হিসাবে বিদ্যমান রয়েছে। যেখানে Non-state actor হিসাবে বর্তমানে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে Arakan Army (AA)।
কিন্তু, আরাকানের মাটিতে রোহিঙ্গা জনপদের অধিবাসীদের স্বার্থের সাথে মিল রয়েছে, বাংলাদেশের মানুষ ব্যতীত আর কারো মাঝে এমনটি লক্ষ্য করা যায়নি। আলোচ্য অঞ্চলটিতে বর্তমান সময়ে রোহিঙ্গারা বিজয়ের স্বাদ পেলে সেখানে কেবলমাত্র বাংলাদেশ লাভবান হতে সমর্থ হবে। অন্যান্যরা যেখানে শুধুমাত্র নিজেদের ক্ষতির বাহিরে আর কিছু দেখতে পায় না। যে বিষয়টি আমাদের নিয়ে আসে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের মূল্য যাচাইয়ের প্রশ্নে।
বর্তমানে আরাকানে আমাদের কোনো মূল্য নাই। কারণ, আরাকান বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলাপ তোলার জন্য বর্তমানে আমাদের হাতে কোনো Hard Power নাই। আমাদের সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনী বর্তমান সময়ে শক্তির হিসাবে আরাকান সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আমাদের সম্মানের স্থান করে দেওয়ার ব্যাপারে অযোগ্য। যা আমাদের নিয়ে আসে পরবর্তী প্রশ্নে। তা হলো, রোহিঙ্গা জনপদের অধিবাসী তথা শরণার্থীদের Hard Power এ রূপান্তর করার যে ধারণা, সেখানে। আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান যার দারুণ প্রয়োগ ঘটাতে সমর্থ হয়েছিলেন। তবে, তাঁর সময়ে তখন শুধু বিষয়টি ঘটিয়ে দেওয়ার হুমকি যথেষ্ট হয়েছিল। আমাদের জন্য যা আর যথেষ্ট নয়।
১৯৭৭ সালে Burmese Armed Forces আরাকানে রোহিঙ্গা জনপদের ওপর Operation Dragon King লঞ্চ করে। ওদের সে বীভৎস নারকীয়তার মাঝে পড়ে রোহিঙ্গা জনপদবাসী তখন দলে দলে ভ্রাতৃতূল্য বাংলার ভূখণ্ডের দিকে ধাবিত হতে থাকেন। এমনকি পরিস্থিতি এমন হয় যে, ০১ বছরের মাঝে বাংলাদেশের ওপর ২,০০০০০ রোহিঙ্গা শরণার্থীর আগমন হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তখন বিষয়টি নিয়ে United Nations, Organisation of Islamic Cooperation (OIC) সহ নানান পর্যায়ে ছুঁটতে শুরু করেন। কিন্তু, মিয়ানমারের তৎকালীন সামরিক সরকারকে তখন কোনোভাবে নমনীয় করা সম্ভব হচ্ছিলো না। ওরা '৭৮ সালের জুলাইয়ে ওদের গণহত্যার অপারেশন বন্ধ ঘোষণা করলেও, বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরতে নিতে অস্বীকার করতে থাকে। তবে, পরিস্থিতি পাল্টে যায় ১৯৭৯ সালে।
তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মিয়ানমারের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল নে ঊঈনের মাঝে একটি রাষ্ট্রীয় সাক্ষাৎ এর আয়োজন করা হয়। সাক্ষাৎ চলাকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জেনারেল নে ঊঈনকে অবগত করেন যে, জেনারেল ঊঈন যদি বাংলার ভূখণ্ডে মানবেতর পরিস্থিতির মাঝে দিন অতিবাহিত করতে থাকা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আরাকানে তাঁদের নিজ জনপদের মাঝে, বার্মার বৈধ নাগরিক হিসাবে ফিরে যাওয়ার সুযোগ না দেন, তাহলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সেসব রোহিঙ্গাদের সামরিক প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রসজ্জিত করে বার্মায় ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তারপর যা হলো, তা ইতিহাস!
১৯৭৯ সাল শেষ হওয়ারও সুযোগ পেলো না! তার আগেই বার্মা প্রায় সকল রোহিঙ্গা শরণার্থীকে নিজ সীমান্তে নিজের নাগরিক হিসাবে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। তারপর কয়েকটি বছর পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ওরা বাংলাদেশের দিকে অত্যাচার করে সরিয়ে দেওয়ার আর চেষ্টা চালায়নি।
বাংলাদেশকে এখন পুনরায় রোহিঙ্গাদের বিষয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের চিন্তাধারায় ফেরত যেতে হবে। কিন্তু, আরাকানে বর্তমানে যে পরিস্থিতিগত পরিবর্তন ঘটেছে, তা বিবেচনায় নিয়ে এবার আমাদেরকে রোহিঙ্গা জনপদের অধিবাসীদের শিক্ষা, সামরিক শিক্ষা ও অস্ত্রে সজ্জিত করে সেখানে প্রেরণ করতে হবে। যেখানে বাংলাদেশকে সমস্ত পর্যায়ে সরাসরি প্রত্যক্ষ কিন্তু পরোক্ষভাবে জড়িত থাকবার দরকার হবে। প্রয়োজনে যে তৎপরতা পরিচালনার ক্ষেত্রে আমরা তুরস্কের মতো অভিজ্ঞ দেশগুলোর সহায়তা নিতে পারি। যার মাধ্যমে আরাকান ও মিয়ানমার পরিস্থিতিতে আমাদের মূল্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় মাত্রায় বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে এবং আমাদের সার্বভৌমত্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়তো সম্ভব হবে।
© Revan M